সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

Flipped Classroom (ফ্লিপড ক্লাসরুম)

 Flipped classroom (ফ্লিপড ক্লাসরুম)

    তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় বিপ্লবের সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের শিখনেও এসেছে বৈচিত্র। প্রযুক্তিকে যথাযথ ব্যবহার করে কীভাবে ফলপ্রসূ শিখন শেখানো কার্যক্রম চালানো যায়, সে বিষয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছেই। E-Learning, Online Class, Blended Learning এর সাথে যুক্ত হয়েছে Flipped classroom. আজ ফ্লিপড ক্লাসরুমের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

    Flipped classroom: flipped classroom হলো শিক্ষা বিজ্ঞানের একটি পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া যেখানে প্রচলিত শ্রেণি কার্যক্রমের পরিবেশকে উল্টিয়ে (Flip/Reverse) দেয়া হয় অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষের প্রচলিত চিত্রকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে  দেওয়া হয়, এবং এমন একটি নির্দেশনামূলক শিখন পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, যাতে শিক্ষার্থী শ্রেণীকক্ষের বাইরেও অনলাইনে শিখতে পারে। এ শিখন পদ্ধতিতে প্রচলিত বাড়ির কাজের মত কার্যক্রমকে স্থানান্তরিত করে (আগেই/পরে শেয়ার করে) এবং শিক্ষার্থীদের কর্মব্যস্ত এবং সক্রিয় রেখে শিখন বৃদ্ধিতে কাজ করে। Abeysekera এবং Dowson (২০১৫) যেমনটি তাদের পরিভাষা সংজ্ঞায়িত করেছেন - the flipped classroom is a set of pedagogical approaches that:

  •  most information-transmission teaching out of class
  •  Use class time for learning activities that are active and social and
  • require students to complete pre- and/or post-class activities to fully benefit from in class work.
 
ছবিঃ https://info.umkc.edu/

করোনা মহামারীর আগেও ফ্লিপ ক্লাসরুমের ধারণাটি বিস্তার করেছিল, কেননা এতে শিক্ষার্থীদের  শিখন অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়। ছাত্র নেতৃত্বাধীন সক্রিয় শিখন, সতীর্থ শিখন কৌশল, স্বতন্ত্র/ব্যক্তি কেন্দ্রীক শিখন হওয়ায় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহ প্রদান এবং যৌক্তিক বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার সহযোগিতা করে প্রতিপাঠে শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণে সক্ষম হন। মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন এবং জটিল বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে ফ্লিপড ভিডিওগুলো শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার জন্য ক্লাসের মূল্যবান ব্যক্তিগত সময় গুলো বাঁচিয়ে দেয়।


সহজ ভাবে বললে, শিক্ষক শ্রেণীতে যে পাঠ উপস্থাপন করবেন তার ধারণা/লেকচার আগেই শেয়ার করবেন (ভিডিও বা অন্য কোন মাধ্যমে) শিক্ষার্থীরা তা দেখে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে আসবে। ফলে ক্লাসের জন্য সে প্রস্তুত থাকবে। অন্যদিকে শিক্ষক আগেই লেকচার/পাঠসূচনা শেয়ার করায় শ্রেণি পাঠদানের সময় প্রচুর ফাঁকা সময় পাবেন। ক্লাস উপস্থাপনে বেঁচে যাওয়া সময়কে তিনি ব্যবহার করবেন, একক কাজ, দলীয় কাজ, সতীর্থ শিখন, প্রজেক্ট তৈরি ইত্যাদিতে ফলে শিখন হবে ফলপ্রসূ। কেননা সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে কর্মব্যস্ত থাকবে। ফলে স্বশিখন হবে। Self help is the best help. অনুরূপে, Self learning is the best learning. 


    Flipped classroom এ যা হয়ঃ ফ্লিপড ক্লাসরুম প্রচলিত শিখন অভিজ্ঞতাকে উল্টিয়ে দেয়। পাঠ উপস্থাপনা বাড়ির কাজ হিসেবে শেয়ার করা হয় এবং ক্লাসের সময়কে বরাদ্দ দেয়া হয় শিক্ষার্থীদের পারস্পারিক আলোচনা এবং আকর্ষণীয় প্রজেক্ট এর মতো কাজে। শ্রেণিকক্ষ Flipping করার মূল লক্ষ্য হলো-

  •  শ্রেণিকক্ষে শিখন পরিবেশ সৃষ্টি ।
  •  শিক্ষার্থীকে তাদের নিজ অবস্থান থেকে শেখার সামর্থ্যবান করা।
  • শিক্ষককে ছাত্রদের ব্যক্তিগতভাবে সময় দেয়ার সুযোগ বাড়িয়ে দেওয়া যা ক্লাশে সম্ভব হয়না। 
ছবিঃhttps://teaching.washington.edu/

পাঠের উপকরণকে শেয়ার করার ফলে শিক্ষার্থীরা বাসায় নিজের মত করে পাঠ শিখতে পারে।  ক্লাসের পূর্বেই সকল মৌলিক তথ্যগুলো শিক্ষার্থীরা জেনে যেতে পারে। ফলে শ্রেণি শিক্ষণে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে তারা নিজেকে প্রস্তুত বোধ করে। ক্লাসের সময় শিক্ষক নির্দেশনামূলক আলোচনা এবং কর্মকাণ্ড প্রদান করে যা পাঠ অনুশীলনে সহায়ক হয়। ক্লাসের সময়কে দলীয় কাজ, অনুধাবন ক্ষমতা মূল্যায়ন, বিষয়বস্তু প্রয়োগ বা ব্যক্তিগত এস্যাইনমেন্টর উন্মুক্ত সময় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সকল কার্যক্রম শিক্ষকের তত্ত্বাবধায়নে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত হবে। কারণ, ফ্লিপড ক্লাসরুম (Flipped classroom) আসলে সরাসরি শিখন(offline learning) এবং অনলাইন শিখনের মিশ্রণ যা ব্লেন্ডেড লার্নিং (Blended Learning) হিসেবে পরিচিত। 


    Flipped classroom বাস্তবায়নে শিক্ষকের ভূমিকাঃ ফ্লিপড ক্লাসরুমের চারটি স্তম্ভ  যাকে F-L-I-P বলা হয়। এর অর্থ  F= Flexible Environment, L= Learning Culture, I= Intentional Content এবং P= Professional Educator. শিক্ষক হিসেবে এই চারটি স্তম্ভ দাঁড় করাতে পারলেই flipped classroom প্রতিষ্ঠা পাবে। তবে, শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যকর করতে শিক্ষক যে সমস্ত পদক্ষেপ নেবেন তা হলোঃ

১. পরিকল্পনা (Planning): যে ক্লাসটি শিক্ষক ফ্লিপ করতে চান, তা চিহ্নিত করা এবং শিখনফলের আলোকে পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করা। 

২. রেকর্ড (Record): চিহ্নিত করা পাঠটির ভিডিও তৈরি করা। ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখা যে মূল উপাদানগুলো(Key elements) এতে প্রস্ফুটিত হচ্ছে কিনা।

bergemann and Sam's (২০১২) তাদের বইতে নির্দিষ্ট করে বলেছেন যে, শুধুমাত্র ভিডিও তৈরি করার জন্য না করে তা প্রয়োজনীয় এবং যথোপযুক্তভাবেই তৈরি করতে হবে। যাতে পাঠ শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে সহযোগী হয়।

৩. শেয়ার (Share): তৈরিকৃত ভিডিওটি ছাত্রদের পাঠাতে হবে এবং তা যেন চিত্তাকর্ষক এবং পরিষ্কার হয় এবং তাতে ব্যাখ্যা করে দিতে হবে যে, ভিডিওর বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ক্লাসে আলোচনা করা হবে। 

৪. পরিবর্তন (change): শিক্ষার্থীরা পাঠটি দেখলে তারা পরবর্তীতে আরও গভীর পাঠের জন্য প্রস্তুত থাকবে। তার জন্য শিক্ষককে সচেতন থাকতে হবে। অর্থাৎ কন্টেন্ট আপডেট করতে হবে।

৫. দল গঠন (Group): বিষয়বস্তু আলোচনার উপযুক্ত পদ্ধতি হলো শিক্ষার্থীদের দল গঠন করে দলীয় কাজ করানো। যেমন, কবিতা, নাটিকা, ভিডিও, ইত্যাদি তৈরি করা। 

৬. পুনঃদল গঠন (Regroup): ক্লাসে আবার পৃথক পৃথকভাবে সকল গ্রুপের কাজ সবার সাথে শেয়ার করবেন, প্রশ্ন করবেন এবং এভাবে ধীরে ধীরে পাঠের গভীরে যাবেন।

৭. প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে সমস্যা সমাধানের উৎসাহী করবেন এবং ফ্লিপ কন্টেন্ট গুলো আকর্ষণীয় করবেন।


    এছাড়াও উল্লিখিত ধাপগুলো সম্পন্ন করার পর পর্যালোচনা(Review), সংশোধন(Revise) এবং পুনরাবৃত্তি (Repeat) এর মত কাজগুলো সম্পাদন করবেন।


    ভারতসহ পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপকভাবে ফ্লিপড ক্লাসরুম পদ্ধতিতে শিখন  কার্যক্রম চলছে। আমাদের দেশেও পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। আশা করা যায় Flipped Classroom  দ্রুতই বিস্তার লাভ করবে। শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকেই ফ্লিপড ক্লাসরুম সম্পর্কে জানা এবং তা বাস্তবায়ন কৌশল আয়ত্ত্ব করা প্রয়োজন। তা না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে। (শেখার উদ্দেশ্যে লেখা)

আরও জানতেঃ https://ahaslides.com/bn/blog/7-unique-flipped-classroom-examples-and-models/

মোঃ রুবেল হক
সহঃ শিক্ষক (গণিত)
বীরগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হাতে কলমে কাজের মাধ্যমে খাদ্য লবণ ও বালুর মিশ্রণ থেকে উপাদানসমূহ পৃথকীকরণ।

 ( একটি নমুণা মাত্র) পরীক্ষণঃ হাতে কলমে কাজের মাধ্যমে খাদ্য লবণ ও বালুর মিশ্রণ থেকে উপাদানসমূহ পৃথকীকরণ। তত্ত্বঃ বালু ও লবণ মিশ্রিত হয় না। তাই বালি ও লবণের সাথে পানি মিশ্রিত করে দ্রবণ তৈরি করতে হয়। যেহেতু বালি/বালু পানিতে দ্রবীভূত হয় না। তাই এ মিশ্রণ থেকে বালিকে আলাদা করতে পরিস্রাবণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। খাদ্য লবণ সহজেই পানিতে দ্রবীভূত হয় । সুতরাং পরিস্রাবণের পর প্রাপ্ত দ্রবণ থেকে বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় পানি থেকে লবণ পৃথক করা হয়।   প্রয়োজনীয় উপাদানঃ খাদ্য লবণ, বালু, পানি, ফানেল, ফিল্টার পেপার, কনিক্যাল ফ্লাস্ক, বিকার, ত্রিপদী স্ট্যান্ড, স্পিরিট ল্যাম্প, তারজালি, নাড়ানী।   কাজের ধাপঃ             ১. বিকারে লবণ ও বালু নিয়ে পরিমানমত পানি যোগ করে নাড়ানী দিয়ে নাড়তে থাকি। যাতে মিশ্রণ তৈরি হয়।             ২. ফিল্টার পেপার কোনক আকৃতির ভাঁজ দিয়ে ফানেলের মুখে লাগাই। এ ফানেল কনিক্যাল ফ্লাস্কের মুখে দিই          ...

ভালোবাসায় ভালোলাগার গণিত

ভালোবাসায় ভালোলাগার গণিত প্রেমের প্রতীক বা ভালোবাসার প্রতীক হচ্ছে ❤ বা heart shape. যদিও বিজ্ঞানে মন বলতে কিছুই নেই। মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন ইলেকট্রনের স্পন্দনই মানুষের আবেগ, অনুভূতি, চিন্তার উৎস। তারপরেও মানুষ মন বা হৃদয়কেই আবেগ-অনুভূতির উৎস ভেবে নেয়। সাধারণত হৃদয় বা হার্ট বলতে আমরা বুঝি আমাদের হার্ট বা হৃদপিণ্ডকে। ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ যে চিহ্ন তা ♥। তবে কি আসলেই মানুষের হার্ট দেখতে এমন? এক সময় গ্রিক-রোমান চিন্তাবিদগণ মনে করতেন, মানুষের হৃদয় দেখতে ❤ বা লাভ চিহ্ন এর মত। কিন্তু তা মোটেই না। হার্ট শেপ এর প্রচলন কিভাবে হয়, তা গুগোল এ সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। আমরা এই ❤ বা হার্টশেপের গণিত নিয়ে আলোচনা করব। নিম্নোক্ত উপায়ে আমরা গাণিতিকভাবে ❤ পেতে পারি ঘূর্ণায়মান বৃত্ত বা বলের সাহায্যে: বহিঃস্পর্শ করে এমন দুটি সমান ব্যাসার্ধের বৃত্তের একটি স্থির রেখে অন্যটিকে চারদিকে ঘুরিয়ে আনলে যে ক্ষেত্র হয়, তাকে গণিতের ভাষায় কার্ডিয়ড বলে যা অনেকটা হার্ট শেপ এর মত। (চিত্র দ্রষ্টব্য) গুণের নামতা সাহায্যে একটি বৃত্তকে সমান দুভাগে ভাগ করে পাই ০, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬,...

এস. এস.সি জীববিজ্ঞান প্রশ্ন দিনাজপুর বোর্ড-২০২১

 এস. এস.সি পদার্থ বিজ্ঞান প্রশ্ন দিনাজপুর বোর্ড-২০২১ ১.৩০ মিনিটের পরীক্ষা। বহুনির্বাচনী ২৫টি হতে ১২ টি। (সময়ঃ ১৫ মিনিট) সৃজনশীল ৮টি হতে ২ টি। (সময়ঃ ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট)