সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জাতি, জাতির জনক


বিবিসি বাংলার ২০০৪ সালে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' শিরোনামের জরিপে প্রথম অবস্থানে বাঙালিরা স্থান দেন প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুর। হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে অনেক মহান ব্যক্তিরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। জাতির ক্রমবিকাশ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে বিশ্বদরবারে স্বাধীন জাতি, বীরের জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এজন্য বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি 'জাতির জনক' বা পিতা বলা হয়। ছাত্রনেতা আ স ম আব্দুর রব ৩ মার্চ, ১৯৭১ সালে পল্টনের ময়দানে বঙ্গবন্ধুকে 'জাতির জনক' উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির জনক বা পিতা। 'জাতির জনক' বা পিতা শব্দটিতে অনেকেরই ঘোর আপত্তি। অনেকেই শব্দটি ব্যবহার করতে নারাজ। অনেক কাঠমোল্লাই আবার এ বিষয় নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে বা করছে। অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও এই কাতারে আছেন। জাতির পিতা শব্দটি বুঝতে হলে আমাদের আগে 'জাতি' কি, তা বোঝা দরকার। জাতির ইংরেজি প্রতিশব্দ Nation শব্দটি ল্যাটিন Natio থেকে এসেছে। যার অর্থ জন্ম। শব্দের উৎপত্তিগত অর্থ থেকে জাতি বলতে একই বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীকে বুঝায়। কিন্তু পৌরনীতির দিক দিয়ে জাতিকে একটি বিশেষ দিক থেকে অর্থাৎ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রামজে মুইর বলেন,'জাতি এরূপ একটি জনগোষ্ঠী বা জনসমষ্টি যারা নিজেদেরকে প্রকৃতিগতভাবে ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ বলে মনে করেন। তাদের ঐক্যবোধ এত দৃঢ় ও বাস্তব যে, তারা একত্রে বাস করে আনন্দ পায় এবং বিচ্ছিন্ন হলে অসন্তুষ্ট হয় এবং তাদের সঙ্গে একই ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ নয় এরূপ লোকের শাসন সহ্য করতে পারেনা।' ১৯৪৭ সালে জিন্নাহর 'দ্বি-জাতি তত্ব'র উপর ভিত্তি করে ভারত ভাগ হয়। একত্রে বাস না করেও, একই সূত্রে অর্থাৎ একই সংস্কৃতি, উপার্জন বা উৎপাদন ব্যবস্থা না হয়েও শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কিন্তু যেহেতু জাতির মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা প্রবল সুতরাং ১৯৪৭ সালের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে। ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতি নিজেদের আত্মপরিচয় ফুটিয়ে তোলে। ম্যাকাইভার বলেন, 'জাতি হলো ঐতিহাসিক পরিস্থিতির দ্বারা সৃষ্ট, আধ্যাত্ম চেতনা দ্বারা সমর্থিত, একত্রে বসবাস করার সংকল্পবদ্ধ সম্প্রদায়গত মনোভাব সম্পন্ন জনসমাজ যারা নিজেদের জন্য সাধারণ শাসনব্যবস্থা গঠন করতে চায়।' জাতির সংক্ষিপ্ত এবং সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হায়েজ। তিনি বলেন, 'একটি জাতীয় সমাস সম্পূর্ণ ঐক্য এবং সার্বভৌম স্বাধীনতা লাভ করে জাতিতে পরিণত হয়'। সুতরাং জাতি বলতে কতগুলো সাধারণ ঐক্যবোধে আবদ্ধ ও সংগঠিত জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বাস করে, যাদের ভাষা, উৎপাদন ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস অভিন্ন। জাতির সংজ্ঞাই আমাদের স্পষ্ট ধারণা দেয় যে, কেন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হলো? কেন বাঙালি স্বাধীনতার জন্য মুক্তি সংগ্রাম করল? যে মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালি জাতি মুক্ত স্বাধীন হয় সেই সংগ্রামের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। জাতি তাঁর আহবানে, তাঁরই নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করে এবং সফল হয়। বিপ্লবী চেতনায় দৃপ্ত রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন ছাত্রজনতা মুক্তিসংগ্রামের ঠিক ঊষালগ্নে বাঙালির জাগরণ দেখে বাঙালির নেতা শেখ মুজিবকে বাঙালি 'জাতির জনক' ঘোষণা করেন। সুতরাং বাঙালি জাতির জনক বা পিতা শব্দটিতে আর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার কোন সুযোগ নেই। যারা করে তাদের হয় পাকিস্তানের ভুত আঁচড় করেছে অথবা তারা অজ্ঞ জাতি বা জাতীয়তা সম্পর্কে। কূপমণ্ডূক জ্ঞানহীন এ গোষ্ঠী জাতি বা জাতীয়তা সম্পর্কে হয়তো কিঞ্চিৎ জানে অথবা জানেই না। 'মানব জাতির পিতা, 'মুসলিম জাতির পিতা' এভাবে যদি জাতিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, সেটি ভিন্ন কথা। বাঙালি জাতির পিতা 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান' এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা থাকা উচিত নয়। যদি কারো থাকে তবে তার বাংলাদেশে থাকার অধিকার থাকে না। মুসলিম দেশ সৌদি আরবের জনক ইবনে সৌদ, ইরানের- সাইরাস দ্যা গ্রেট, মালয়েশিয়ার- টুংকু আব্দুর রহমান, তুর্কি- মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক। পৃথিবীর সব জাতিরই জনক আছে তাহলে আমাদের 'জাতির জনক' নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা বা করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হাতে কলমে কাজের মাধ্যমে খাদ্য লবণ ও বালুর মিশ্রণ থেকে উপাদানসমূহ পৃথকীকরণ।

 ( একটি নমুণা মাত্র) পরীক্ষণঃ হাতে কলমে কাজের মাধ্যমে খাদ্য লবণ ও বালুর মিশ্রণ থেকে উপাদানসমূহ পৃথকীকরণ। তত্ত্বঃ বালু ও লবণ মিশ্রিত হয় না। তাই বালি ও লবণের সাথে পানি মিশ্রিত করে দ্রবণ তৈরি করতে হয়। যেহেতু বালি/বালু পানিতে দ্রবীভূত হয় না। তাই এ মিশ্রণ থেকে বালিকে আলাদা করতে পরিস্রাবণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। খাদ্য লবণ সহজেই পানিতে দ্রবীভূত হয় । সুতরাং পরিস্রাবণের পর প্রাপ্ত দ্রবণ থেকে বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় পানি থেকে লবণ পৃথক করা হয়।   প্রয়োজনীয় উপাদানঃ খাদ্য লবণ, বালু, পানি, ফানেল, ফিল্টার পেপার, কনিক্যাল ফ্লাস্ক, বিকার, ত্রিপদী স্ট্যান্ড, স্পিরিট ল্যাম্প, তারজালি, নাড়ানী।   কাজের ধাপঃ             ১. বিকারে লবণ ও বালু নিয়ে পরিমানমত পানি যোগ করে নাড়ানী দিয়ে নাড়তে থাকি। যাতে মিশ্রণ তৈরি হয়।             ২. ফিল্টার পেপার কোনক আকৃতির ভাঁজ দিয়ে ফানেলের মুখে লাগাই। এ ফানেল কনিক্যাল ফ্লাস্কের মুখে দিই          ...

ভালোবাসায় ভালোলাগার গণিত

ভালোবাসায় ভালোলাগার গণিত প্রেমের প্রতীক বা ভালোবাসার প্রতীক হচ্ছে ❤ বা heart shape. যদিও বিজ্ঞানে মন বলতে কিছুই নেই। মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন ইলেকট্রনের স্পন্দনই মানুষের আবেগ, অনুভূতি, চিন্তার উৎস। তারপরেও মানুষ মন বা হৃদয়কেই আবেগ-অনুভূতির উৎস ভেবে নেয়। সাধারণত হৃদয় বা হার্ট বলতে আমরা বুঝি আমাদের হার্ট বা হৃদপিণ্ডকে। ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ যে চিহ্ন তা ♥। তবে কি আসলেই মানুষের হার্ট দেখতে এমন? এক সময় গ্রিক-রোমান চিন্তাবিদগণ মনে করতেন, মানুষের হৃদয় দেখতে ❤ বা লাভ চিহ্ন এর মত। কিন্তু তা মোটেই না। হার্ট শেপ এর প্রচলন কিভাবে হয়, তা গুগোল এ সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। আমরা এই ❤ বা হার্টশেপের গণিত নিয়ে আলোচনা করব। নিম্নোক্ত উপায়ে আমরা গাণিতিকভাবে ❤ পেতে পারি ঘূর্ণায়মান বৃত্ত বা বলের সাহায্যে: বহিঃস্পর্শ করে এমন দুটি সমান ব্যাসার্ধের বৃত্তের একটি স্থির রেখে অন্যটিকে চারদিকে ঘুরিয়ে আনলে যে ক্ষেত্র হয়, তাকে গণিতের ভাষায় কার্ডিয়ড বলে যা অনেকটা হার্ট শেপ এর মত। (চিত্র দ্রষ্টব্য) গুণের নামতা সাহায্যে একটি বৃত্তকে সমান দুভাগে ভাগ করে পাই ০, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬,...

এস. এস.সি জীববিজ্ঞান প্রশ্ন দিনাজপুর বোর্ড-২০২১

 এস. এস.সি পদার্থ বিজ্ঞান প্রশ্ন দিনাজপুর বোর্ড-২০২১ ১.৩০ মিনিটের পরীক্ষা। বহুনির্বাচনী ২৫টি হতে ১২ টি। (সময়ঃ ১৫ মিনিট) সৃজনশীল ৮টি হতে ২ টি। (সময়ঃ ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট)